মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

জেলার ঐতিহ্য

নওগাঁ জেলার ঐতিহ্য : আদিবাসী

 

বাঙালি এক সংকর জন। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে আরম্ভ করে একের পর এক যেসব জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে এসে বসবাস করেছে, প্রবহমান রক্তধারায় নিজেদের রক্তের মিশ্রণ ঘটিয়েছে, তাদের থেকে কালক্রমে বাঙালি জাতির উদ্ভব হয়েছে। প্রাচীন বাঙলার সেই সব নরগোষ্ঠীর প্রভাব প্রচ্ছন্ন রয়েছে বাঙালির রক্তে ও দেহ গঠনে, ভাষায় ও সভ্যতার বাসত্মব উপাদানে এবং মানস সংস্কৃতিতে। তারই প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে বাঙালির প্রাচীন সমাজ বিন্যাসে। ওইসব আদিম অধিবাসী হল বাঙলার আদিবাসী।

 

 

(ক) আদিবাসী ও উপজাতি :

 

আদিবাসী শব্দটির ইংরেজী প্রতিশব্দ Aborigines. Encyclopaedia Brittannica (১৯১০)-তে বলা হয়েছে, In modern times the term " Aborigines " has been extended in signification, and used to indicate the inhabitants found in a country at its first discovery , in contradistinction to colonies or new races, thee time of whose introduction into the country is known.

 

আদিবাসী অর্থে Aboriginalশব্দটি বহুল প্রচলিত। এর দ্বারাও কোনো এলাকার প্রাচীনতম কাল থেকে কিংবা ওই এলাকা পরিচিতি-লাভের সময় থেকে বর্তমান কোনো নরগোষ্ঠিকে বুঝানো হয়।

 

বহুকালব্যাপী পারস্পরিক মিশ্রণ প্রক্রিয়ায় ও বিচিত্র জনসংঘর্ষের চাপে অনেক ক্ষেত্রে আদিম কৌম সমাজগুলো ক্রমশ ভেঙে বৃহত্তর জনসমাজে লীন অথবা লুপ্ত হয়ে গেছে। তার মধ্য দিয়েও যে সব নরগোষ্ঠী আদিম জীবন যাত্রা প্রণালীকে মোটামোটিভাবে অনুসরণ করে আসতে পেরেছে তাদেরকেই আদিবাসী বলে গণ্য করা হয়। কয়েকটি সাধারণ লক্ষণ দ্বারা কোনো নরগোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়: (১) আদিবাসী হতে তাদের জন্ম, (২) আদিম জীবন যাত্রা প্রণালী, (৩) দুরধিগম্য স্থানে বাস, (৪) অনুন্নত অবস্থা।

 

অবশ্য এই সাধারণ লক্ষণগুলো দ্বারা উপজাতিদেরও চিহ্নিত করা যায় এবং শ্রী অতুল সুর তাঁর ‘বাঙালির নৃতাত্তিক পরিচয়’ পুসত্মকে উপজাতিসমূহের সাধারণ লক্ষণ হিসেবেই ওই বৈশিষ্টগুলো উল্লেখ করেছেন (পৃঃ ২৫)। অবশ্য তাঁর বিবেচনায় আদিবাসী ও উপজাতি সমার্থক। শুধু তাই নয়, আরও অনেক লেখকের রচনায় এবং সরকারি  বিধি বিধানেও আদিবাসী ও উপজাতি শব্দ দুটিকে সমার্থক গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু উপজাতি একটি পৃথক শব্দই শুধু নয়, এর ব্যঞ্জনা এবং তাৎপর্যও আলাদা। উপজাতি শব্দের ইংরেজি প্রতি শব্দ Tribe . Tribeশব্দটি সম্পর্কে Encyclopedia Britannica(১৯১১) তে বলা হয়েছে, Its ethnological meaning has come to be any aggregate of families or small communities which are grouped together under one chief or leader, observing similiar customs and social rules, and tracing their descent from one comm0n ancestor .

 

এই উদ্ধৃতি থেকে স্পষ্ট হয় যে, Tribe বা উপজাতিগণ Aboriginesবা আদিবাসী নয়। দৃষ্টামত্ম হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের কথা বলা যেতে পারে। তারা মূলত বর্তমান মিয়ানমার (ব্রহ্মদেশ) এর আরাকান অঞ্চল থেকে পর্যায়ক্রমে পার্বত্য চট্টগ্রামে আগত অধিবাসী এবং খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর পূর্বে এখানে তাদের বসবাসের কোন ইতিহাস মিলে না। তারা বাংলাদেশের মৌলিক অধিবাসী নয়। বাংলাদেশের জনগণের রক্তপ্রবাহে এই ব্রহ্ম-মোঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর বিশেষ কোন চিহ্ন নেই। কিন্তু তারা উপজাতীয় বৈশিষ্টগুলো লালন করে আসছে। সুতরাং তাদেরকে বাংলাদেশের আদিবাসী না বলে উপজাতি বলাই যুক্তিযুক্ত। মোঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর অমত্মর্ভূক্ত বৃহত্তর ময়মনসিংহের গারো হাজংদের সম্পর্কেও একই কথা বলা চলে।

প্রকৃত পক্ষে, কারা বাংলাদেশের আদিম অধিবাসী ছিল এবং সেইসব আদিবাসীর বর্তমান বংশধর হিসেবে কারা গণ্য হতে পারে, মাত্র কয়েকটি বাহ্য লক্ষণ দ্বারা তা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। এর জন্য নৃতত্ত্ব গবেষকদের দ্বারস্থ হওয়া আবশ্যক।

 

নৃতাত্ত্বিক যদি দেশের বিভিন্ন বর্ণের ও শ্রেণীর জনসাধারণের রক্ত ও দেহ গঠনের বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণের দ্বারা জনতত্ত্ব নিরূপণে প্রয়াসী হন এবং সেই প্রয়াসের সঙ্গে যদি ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্ত্বিকের জ্ঞান ও দৃষ্টির মিলন ঘটে তবেই সঠিক সিদ্ধামেত্ম উপনীত হওয়া সম্ভব। বাংলাদেশে নৃতত্ত্ব গবেষণায় রক্ত বিশ্লেষণ সামান্যই হয়েছে। দেহ গঠনের বিশ্লেষণেও এ যাবৎ যা স্বীকৃত ও অনুসৃত হয়েছে তা কেবল নরমুন্ড, নরকপাল ও নাসিকার পরিমিতি ও পরস্পর অনুপাত এবং চুল, চোখ ও চামড়ার রং অবলম্বন করে। অধিকন্তু লোকসংখ্যার অনুপাতে তা যথেষ্ট নয়। বাংলা ভাষার বিশ্লেষণ অবশ্য অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু প্রাচীন ও বর্তমান বাসত্মব সভ্যতা এবং মানসিক সংস্কৃতির বিশ্লেষণে অগ্রগতি সামান্য। তথাপি যা অর্জিত হয়েছে তাকে ভিত্তি করে নব-নির্ণীত ইতিহাসই হচ্ছে এ ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক ।

 

(খ) বাঙলার আদিম অধিবাসীগণ

 

নৃতত্ত্ববিদদের মতে ভারতীয় জনসৌধের প্রথম সত্মর নেগ্রিটো বা নিগ্রোবটু জন। বহু যুগ পূর্বেই বিলীন হয়ে গেলেও এক সময় এই জাতি ভারতে ও বাঙলার স্থানে স্থানে সুবিস্তৃত ছিল। বাংলাদেশে নিম্নবর্ণের কোনো কোনো সম্প্রদায়ের লোকেদের অবয়বে নিগ্রোবটুদের রক্তের কিছুটা প্রভাব রয়ে গেছে বলে অনুমিত হয়। এই মিশ্রণটা ঘটেছিল পরবর্তী আদি অস্ট্রেলীয়দের সঙ্গে।

 

নিগ্রোবটুদের পরে আসে আদি-অস্ট্রেলীয় বা আদি-অস্ত্রাল নরগোষ্ঠী। আদি-অস্ত্রাল বলবার কারণ, অস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীদের সঙ্গে তাদের দৈহিক গঠনের এবং রক্তের মিল আছে। নৃতত্ত্ববিদগণ মনে করেন, অনুমান ৩০,০০০ বছর পূর্বে তাদের এক শাখা ভারত থেকে প্রথম অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে গিয়েছিল। শ্রী অতুল সুর লিখেছেন, আদি-অস্ত্রাল জাতির লোকেরা খর্বাকার, তাদের মাথার খুলি লম্বা থেকে মাঝারি, নাক চওড়া ও চ্যাপ্টা, গায়ের রঙ কালো এবং মাথার চুল ঢেউ খেলানো। বাঙলার আদিম অধিবাসীরা এই গোষ্ঠীরই লোক।

 

জার্মান পন্ডিত ফন আইকস্টেডট এই নরগোষ্ঠীর মধ্য ও পূর্ব-ভারতীয় শাখার নাম দিয়েছেন ‘কোলিড’। নিম্নর্ণের বাঙালির মধ্যে আদি-অস্ট্রেলীয়দের প্রভাবই বেশি। বাংলাদেশের বিশেষভাবে রাঢ় বাঙলার সাঁওতাল, ভূমিজ, মুন্ডা, বাঁশফোঁড়, মাল পাহাড়ীরা আদি-অস্ট্রেলীয়দের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এছাড়া বেদিয়া, বিরহড়, চেরো, গোন্ড, গোরাইত, হো, করমালী, খারওয়ার, কোরওয়া, লোহারা, মাহালী, নাগেসিয়া, পারহাইয়া, সওরিয়া পাহাড়িয়া এবং মবররাও এই গোষ্ঠীর অমত্মর্ভূক্ত। বস্ত্তত এরাই হচ্ছে বাঙলার আদিম অধিবাসীদের বংশধর ।

 

আদি-অস্ট্রেলীয় বা আদি-অস্ত্রালরা যে ভাষায় কথা বলত সে ভাষাকে বলা হয় ‘অস্ট্রিক’। এই ‘অস্ট্রিক’ ভাষাই বাংলা ভাষার ভিত্তি স্থাপন করে। কেননা, বাংলা ভাষার অমত্মর্ভূক্ত এই ভাষার শব্দসমূহের প্রাচুর্য তার সাক্ষ্য বহন করছে। ভাররেত এই ভাষার বর্তমান প্রতিভু হচ্ছে ‘মুন্ডারী’ ভাষা- যে ভাষা সাঁওতাল, মুন্ডা, কোরওয়া, জুয়াঙ, কোরবু প্রভৃতি জাতিসমূহ ব্যবহার করে। যদিও অস্ট্রিক ভাষার শব্দসমূহ ভারতের সব ভাষার মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায়, তবুও বাংলা ভাষায় এর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। অস্ট্রিক ভাষাভাষী জাতিসমূহের বৈশিষ্ট হচ্ছে, ‘কুড়ি’ সংখ্যাকে ভিত্তি করে উচ্চতর সংখ্যা প্রকাশ করা।

 

আদি-অস্ট্রেলীয়রাই বাংলাদেশে কৃষি নির্ভর সভ্যতা ও সংস্কৃতির সূচনা করেছিল বলে মনে হয়। তাদের প্রধান খাদ্য ছিল ধান এবং নদীবহুল বাঙলা আসাম ওড়িশা ও দক্ষিণ-ভারতের সমুদ্রশায়ী সমতল অঞ্চলে তারাই ধান চাষের প্রচলন করেছিল। লাঙল কথাটি এসেছে অস্ট্রিক ভাষা থেকে। এছাড়া তারা কলা, বেগুন, লাউ, লেবু, পান(বর), নারিকেল, জাম্বুরা(বাতাবি লেবু), কামরাঙ্গা,ডুমুর, হলুদ, সুপারি, ডালিম ইত্যাদির চাষ করত। বাঙালির প্রিয় এসব খাদ্যবস্ত্তর নামও মূলত অস্ট্রিক ভাষা থেকে গৃহীত। কর্পাস(কার্পাস) এবং কম্বলও তাই। এসব বিবেচনা করে নীহারঞ্জন রায় বলেন, ‘অস্ট্রিক ভাষী’ আদি অস্ট্রেলীয়রা ছিল মূলত কৃষিজীবী। কিন্তু ইহাদের সবারই জীবিকা ছিল কৃষিকার্য, একথা বলা যায় না। কতকগুলি শাখা অরণ্যচারীও ছিল। এই অরণ্যচারী নিষাদ ও ভীল, কোল শ্রেণীর শবর, মুন্ডা, গদব, হো, সাঁওতাল প্রভৃতিরা প্রধানত ছিল পশু শিকারজীবী এবং পশু শিকারে ধনুর্বাণই ছিল তাদের প্রধান অস্ত্রোপকরণ। বাণ, ধনু বা ধনুক, পিনাক-এই সব-কটি শব্দই মূলত অস্ট্রিক। চিত্রে আদিবাসী নারী-পুরুষ তাদের ঐতিহ্য একত্রে  ধান রোপন করা । সে ধান রোপনের দৃশ্ব ।

 

  

চিত্র সংগ্রহ ও সংযোজন: ড. মোজাফফরআহমেদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), নওগাঁতারিখ: ২৫ ফেরুয়ারী ২০১০

 

 

নিম্ন, পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গে বহুল প্রচলিত গুঁড়িকাঠের লম্বা ডোঙার ব্যবহার অস্ট্রিকভাষীদের নিকট থেকে প্রাপ্ত। ডোঙা কথাটিও অস্ট্রিক ভাষার।

 

বাঙালির বিভিন্ন সামাজিক আচার অনুষ্ঠানের মধ্যেও অস্ট্রিকভাষী জনের ব্যাপক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। আমাদের নানা আচারানুষ্ঠানে, ধর্ম, সমাজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আজও ধান, ধানের গুচ্ছ, দূর্বা, কলা, হলুদ, সুপারি, নারিকেল, পান, সিন্দুর, কলাগাছ প্রভৃতি অনেকখানি স্থান জুড়িয়া আছে। লক্ষণীয় এই যে, ইহার প্রত্যেকটিই অস্ট্রিক ভাষাভাষী জনদের দৈনন্দিন জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধে আবদ্ধ।

 

এই আদি-অস্ত্রালদের সঙ্গে এসে মিশেছিল আগন্তুক দ্রাবিড়ভাষী দীর্ঘমন্ডু নরগোষ্ঠী। এদের সঙ্গে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের জাতিসমূহের এবং আদি মিশরীয়দের মিল রয়েছে। সেজন্য এদেরকে ‘ভূমধ্য’ বা ‘মেডিটেরেনিয়ান’ নরগোষ্ঠীও বলা হয়।

 

দক্ষিণ ভারতের বর্তমান দ্রাবিড়ভাষীদের সঙ্গে এদের দেহ লক্ষণের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ফন আইকস্টেডট-এঁর বিবেচনায় এরা কোলমুন্ডা নরগোষ্ঠীর আত্মীয়। তিনি এদেরকে বলেন ভারতীয় ‘মেলানিড’। অবশ্য দ্রাবিড় কোন নরগোষ্ঠী নয়, ভাষাগোষ্ঠীর নাম। লক্ষ্য করবার বিষয়, বাংলা ভাষায় দ্রাবিড় ভাষার অনেক শব্দ পাওয়া গেলেও দ্রাবিড়দের সঙ্গে বাঙালির খুব একটা রক্ত-সম্বন্ধ নেই। আদি-অস্ট্রেলিয় (এবং দ্রাবিড় ভাষী)-দের ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আর এক গোলমুন্ড অআর্য ভাষাভাষী জন বাঙলায় এসে নিজেদের রক্ত প্রবাহ সঞ্চারিত করেছিল। এদেরকে অ্যালপাইন বা অ্যালপো-দীনারীয় নরগোষ্ঠী নামে অভিহিত করা হয় । নীহারঞ্জন রায় বলেন, ‘বাঙলাদেশের উচ্চবর্ণের ও উত্তম সংকর বর্ণের জনসাধারণের মধ্যে যে গোল ও মধ্যম মুন্ডাকৃতি, তীক্ষ্ণ ও উন্নত এবং মধ্যম নাসাকৃতি ও মাধ্যমিক দেহ দৈর্ঘ্যের লক্ষণ পাওয়া যায়, তাহা অনেকাংশে এই নরগোষ্ঠীর দান। বস্ত্তত বাংলাদেশের যে জন ও সংস্কৃতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহার প্রায় সমগ্র মূল রূপায়ণই প্রধানত অ্যালপাইন ও আদি অস্ট্রেলীয়, এই দুই জনের লোকেদের কীর্তি।

 

অ্যালপাইনদের পরে আসে আদি-নর্ডিক নরগোষ্ঠী। বৈদিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির সংস্কৃতির স্রষ্টা এই আদি-নর্ডিকদের আর্যভাষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতি ঐতিহাসিককালে বহু শতাব্দী ধরে বাংলাদেশে সঞ্চারিত হয়ে এবং পূর্বতন সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে আত্মসাৎ করে নতুনরূপে আত্মপ্রকাশ করলেও বাঙ্গালির রক্ত ও দেহগঠনে এদের দান অতি অল্প।

 

আদি-নর্ডিকদের পরে মোঙ্গোলরাই ঐতিহাসিককালে বাংলাদেশে আগত সর্বশেষ জনধারা। উত্তরবঙ্গের কোচ পলিয়া রাজবংশী এবং মুসলমানদের মধ্যে এদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

 

ঐতিহাসিকটি কালের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উপলক্ষে আরও কয়েকজন বাংলাদেশে এসেছে এবং বাংলাদেশের বাসিন্দা হয়ে বিশাল জনপ্রবাহে লীন হয়ে গেছে।

 

সার কথা এই যে, নিগ্রোবটু, আদি-নর্ডিক ও মোঙ্গলীয় ক্ষীণ প্রভাব সত্ত্বেও নৃতত্ত্বের দিক থেকে বাংলার জনগোষ্ঠী দীর্ঘমন্ডু, প্রশসত্মনাস আদি-অস্ট্রেলীয় বা ‘কোলিড’, দীর্ঘমুন্ড, দীর্ঘ ও মধ্যে অন্নতনাস মিশর-এশীয় বা মেলানিড এবং গোলমুন্ড ও উন্নতনাস অ্যারপাইন বা ‘পূর্ব ব্র্যাকিড’, মোটামোটি এই তিন জনের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে। এই সব নরগোষ্ঠীর বিচিত্র আদান প্রদান ও মিশ্রণের ফলে বাঙালির এক নিজস্ব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বৈশিষ্ট্য দাঁড়িয়ে গেছে। সাধারণভাবে, ‘বাঙালির চুল কালো, চোখের মণি পাতলা হইতে ঘন বাদামী  বা কালো, গায়ের রং সাধারণত পাতলা হইতে ঘন বাদামী, নিম্নতম শ্রেণীতে চিক্কণ ঘন শ্যাম পর্যমত্ম। দেহ-দৈর্ঘ্যের দিক হইতে বাঙ্গালী মধ্যমাকৃতি, খর্বতার দিকে ঝোঁকও অস্বীকার করা যায়না। বাঙালির মুন্ডাকৃতি সাধারণত দীর্ঘ, উচ্চ বর্ণসত্মরে গোলের দিকে বেশি ঝোঁক। নাসাকৃতিও মোটামোটি মধ্যম, যদিও তীক্ষ্ণ ও উন্নত নাসাকৃতি উচ্চতর বর্ণের লোকদের ভিতর সচরাচর সুলভ।

 

(১) সাঁওতাল:

 

উত্তরবঙ্গ তথা রাজশাহী বিভাগের যেসব জেলায় আদিবাসী বমবাস অপেক্ষাকৃত বেশি তার মধ্যে নওগাঁ অন্যতম। এ জেলায় সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁড়াও, মাল পাহাড়ী, কুর্মি, মহালী, বাঁশফোড় প্রভৃতি বেশ কয়েকটি আদিবাসী গোষ্ঠী বসবাস করে। নওগাঁ জেলায় নব পর্যায়ে সাঁওতালদের আগমন ঘটে পর্যায়ক্রমে ও ধীরে ধীরে। শোনা যায় ১৮৫৫-৫৬ সালে বিদ্রোহের দায়ঝক্কি এড়ানোর জন্য কিছু সাওতাল দুই দলে বিভক্ত হয়ে নওগাঁ পার হয়ে মালদহের দিকে চলে আসে। তার একটি দল বামনগোলা থানার পাকুড়িয়া হাটে আশ্রয় নেয়। অন্য দল হিলির জমিদার আকবর চৌধুরীর আশ্রয়ে ওঠে। বস্ত্তত মালদহ-দিনাজপুরের ভূ-স্বামীরা ১৮৭০ সালের পর থেকে চাষাবাদের জন্য সাঁওতালদের আনতে শুরু করেন। ১৮৮১ সালে পত্নীতলা থানায় ১০ জন এবং পোরশায় ১৫৯ জনসহ আজকের নওগাঁ জেলা সীমানার মধ্যে ১৬৯ জন মাত্র সাঁওতাল ছিল। পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যে পত্নীতলাতেই তাদের সংখ্যা বেড়ে হয় ১০২০ জন। অবশ্য পোরশায় ২০৯ জন মাত্র। ওই সময় শুন্যের স্থলে মান্দায় ৫৬৭ জন ও নওগাঁয় ১৭৫ জন সাঁওতাল নারী-পুরুষের আগমন ঘটে। এ নিয়ে নওগাঁ জেলায় তাদের সর্বমোট সংখা দাঁড়ায় ১৯৭১ জন। কখনও আত্রাই, বদলগাছি, মহাদেবপুর থানায় কোন সাঁওতাল ছিল না। বর্তমানে নওগাঁ জেলায় প্রায় দশ সহস্রাধিক সাওতাল নরনারীর বসবাস।

 

 

(২) মুন্ডা :

 

মুন্ডা কয়েকটি আদি অধিবাসী জাতি সমষ্টির সাধারণ নাম। আর্যরা যখন এ দেশে আগমন করে তখন মুন্ডারা তাদের প্রতিবেশি ছিল। আর্যদের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে মুন্ডারা পিছু হটতে থাকে এবং পরিশেষে পূর্ব ও মধ্য ভারতের দূর্গম ও পার্বত্য অঞ্চলে গুপ্তভাবে বসবাস করতে থাকে। নওগাঁ জেলার মুন্ডাগণ গোত্র বিভাজনের মতো মুন্ডা ও পাহান এই দুটি ভাগে বিভক্ত। এর কারণ জানা যায়নি। অনেক পাহান মুন্ডা বললে অসন্তুষ্ট হন। অনেকে মুন্ডা হিসেবে পরিচিত এবং তাদের মধ্যে সে পরিচয় আড়াল করার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়না। এ জেলার মহাদেপুর থানাতে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পাহানের বাস। মুন্ডা বসবাসও নিতামত্ম কম নয়। ধামইরহাট থানায় বহু মুন্ডা পাহান বসতি রয়েছে। পত্নীতলা, নওগাঁ, মান্দা, বদলগাছি থানায় মুন্ডা পাহানের বসবাস আছে। নিয়ামতপুর ও পোরশা থানার বিভিন্ন গ্রামেও বহু সংখ্যক মুন্ডা ও পাহান বসবাস করে। বাংলাদেশের মধ্যে সম্ভবত নওগাঁ জেলাতেই সবচেয়ে বেশি মুন্ডা বাস করে।

 

(৩) ওঁরাও (Oraon):

 

কেলা জাতি হো, ওঁরাও, মুন্ডা প্রভৃতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত। বর্তমানে নওগাঁ জেলায় বসবাসকারী ওঁরাওদের প্রায় সকলেরই আদি নিবাস ছিল রাঁচি জেলায়। মহাদেবপুর থানার এনায়েতপুর নিবাসী বলরাম সরদার (ওঁরাও) এর পিতামহ খরেয়া ওঁরাও প্রথমে কাজের সন্ধানে এদেশে আসেন তখন ওই দেশে খুব অভাব দেখা দিয়েছিল। পরে এখানেই থেকে যান। বলরামের পিতা বন্ধুরামও চলে আসেন। ফলে রাঁচিতে খাজণা বাঁকির দায়ে জমি নিলাম হয়। বলরামের এক চাচা সেই জমি জমিদারের নিকট পত্তন নেয়। যোয়ানপুরের রঘুনাধ ওঁরাও -এর পিতামহ বাহাদুর ওঁরাও রাঁাচি থেকে এদেশে আসেন। ঘুনাথের পিতা মাংরা ওঁরাও ও এদেশে আসেন।

 

নওগাঁ জেলায় ওঁরাও বসতির প্রথম সুস্পষ্ঠ উল্লেখ পাওয়া যায় ১৮৯১ এর সেন্সোস রিপোর্টে। তদানুসারে তৎকালীন রাজশাহী জেলার অমত্মর্গত নওগাঁ মহকুমার তিনটি থানায় ওঁরাওদের সর্বমোট সংখ্যা ছিল ৭৭৬জন মাত্র। তার মধ্যে মান্দা থানায় পুরুষ ৩৩৯জন, নারী ১২২ জন; নওগাঁ থানার পুরুষ ৯৬জন নারী ১৩জন এবং পাঁচুপুর থানার পুরুষ ৭৮জন ও নারী ১২জন মাত্র। ওই তিনটি থানা নিয়েই নওগাঁ মহকুমা গঠিত হয়েছিল। তখন সমগ্র রাজশাহী জেলায় তাদের সংখ্যা ছিল ১৪১৩জন। ওই রিপোর্ট অনুসারে দিনাজপুর জেলার সদর মহকুমাধীন মহাদেবপুর থানার ওঁরাও পুরুষ ৫৬ ও নারী ৫২ এবং পোরশা থানার পুরুষ ৫ ও নারী ৩জন মাত্র ছিল। সমগ্র দিনাজপুর জেলায় তাদের সংখ্যা ছিল ১৩৮৬জন। কিন্তু দিনাজপুর জেলার পত্নীতলা থানাতে এবং বগুড়া জেলার কোন থানাতেই তখন পর্যমত্ম কোন ওঁরাও বসতির কথা জানা যায় না। সুতরাং বদলগাছী থানাতেও কোন ওঁরাও ছিল না। এই থানাগুলো তখন নওগাঁ জেলার অমত্মর্গত।

 

উল্লিখিত থানা সমূহের দু’টিতে ওঁরাওদের অনুপস্থিতি এবং অপরগুলোতে বিদ্যমার ওঁরাও নারী পুরুষদের সংখ্যায় ব্যাপক তারতম্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, তখন সময়টা ছিল এই জেলায় ওঁরাও বসতির প্রাথমিক পর্যায়। তখনও সব ওঁরাও পুরুষ তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে আসেনি।

 

নওগাঁ জেলার ওঁরাওদের মধ্যে টিকরি, কুজর, মিনজু, টোপোর বা টোপ্প, এক্কা, লাকড়া প্রভৃতি গোত্র এবং মন্ডল ও সরদার পদবী পাওয়া যায়। অবশ্য পত্নীতলা থানার কাঁটাবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ভূপেন্দ্রনাথ সরকার এবং নিয়ামতপুর থানার ৫নং রসুলপুর ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান জয়চাঁদ ওরফে চন্দ্রশেখর ঘোষ এবং তার চাচাতো ভাই ন্যাশনাল পাশ ডাক্তার শুকচাঁদ সরদারও ওঁরাও সম্প্রদায়ের লোক। একই পরিবারে দুই রকম পদবী দেখে ধারনা করা হয় নতুন পদবীও আরোপিত হচ্ছে।

 

কথিত আছে যে, বহুকাল পূর্বে ওঁরাওদের এক পূর্বপুরুষ ধর্মপাঠ করছিলেন। ধর্মপাঠ করতে করতে তাঁর ধর্ম হিসেবে ওঁরাও নাম লেখা পড়ে। সেই থেকে  এরা ওঁরাও নামে পরিচিতি লাভ করে। পোরশা অঞ্চলে ওঁরাওদের ওড়ন বলা হয়।

 

নওগাঁ জেলার আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে ওঁরাওদের স্থান তৃতীয় হতে পারে। তাদের সংখ্যা সাঁওতাল এবং মুন্ডা-পাহানদের প্রায় কাছাকাছি।

 

সাবেক মান্দা থানার অংশ বিষে নিয়ে গঠিত নিয়ামতপুর থানাতেই সম্ভবত সবচেয়ে বেশী ওঁরাও বসতি রয়েছে। এই থানার ৭নং গইল ইউনিয়নের গইল-বড়ডাংগা গ্রামে ৩০টির মতো ওঁরাও পরিবারের বাস। মাশনা গ্রামেও প্রায় ১৫টি ওঁরাও পরিবার বাস করে। ৪নং নিয়ামতপুর ইউনিয়নের চৌরাসমরা গ্রামের মতিলাল ওঁরাও একজন হাইস্কুল শিক্ষক। কুশমইল গ্রামেও কয়েকজন শিক্ষিত ওঁরাও আছে। ৫নং রসুলপুর ইউনিয়নের পানি আন্ডাতে প্রায় ১৫ ও পারইল ইউনিয়নের ফুলাহার গ্রামে ২০টির মতো ওঁরাও পরিবারের বাস। এ ছাড়া ধরমপুর, চন্দননগর, বা ঐ চন্ডিলক্ষীপুর, চান্দইল প্রভৃতি গ্রামেও ওঁরাও বসতির কথা জানা যায়।

 

পোরশা থানার শুঁড়িপুকুর গ্রামে প্রায় ১৫০টি ও কামারধাতে প্রায় ৮০/৯০টি ওঁরাও পরিবার আছে। কামারধার ওঁরাওদের কারো কারো অবস্থা বেশ সচ্ছল। সরিয়লা গ্রামেও এদের পরিবার সংখ্যা ৫০-এর মতো। এছাড়া কালাইবাড়ি, আমদা, গাঙ্গুরিয়া, দেউলিয়া, সরাইগাছি, হাড়ভাঙ্গাখাড়ি, মুসাবই, নোনাহার, শিশা, বিষ্ণুপুর প্রভৃতি আদিবাসী অধ্যুষিত অনেক গ্রামেই ওঁরাও বসতি রয়েছে।

 

সাপাহার, পত্নীতলা থানার ঠাকরাপাড়া, শিয়াড়া, পাইকবান্দা, তিলনা, নকুচা, মধইল/ নোদন প্রভৃতি গ্রামে ওঁরাও বসতি আছে। পত্নীতলার সন্নিহিত পাটিচরা ও উষ্টি গ্রামে খ্রিস্টান ওঁরাও পরিবারের বাস। মহাদেবপুর থানার এনায়েতপুরে প্রায় ৫৫টি পরিবার বাস করে। যোয়ানপুরের পাঁচ-ছয়টি ওঁরাও পরিবার খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। এই থানার কাছাইল, চেরাগপুর, মহেশপুর, গোফানগর, ভগবতীপুর, বকাপুর, নাটশাল, গোপালপুর, শালগ্রাম, সাড়তা,  কুসুমশহর, কালুশহর, ঘোংরা, ঘোষপুকুর, বনগাঁও, জয়ন্তীগ্রাম, দেওয়ানপুর, শেরপুর প্রভৃতি গ্রামে কমবেশি ওঁরাও বসতি আছে।

বদলগাছী থানার রসুলপুর, বালুভরা, নওগাঁ থানার কোচগাড়ি; মান্দা থানার কালীগ্রাম, কালীসফা, দেলুয়াবাড়ি অঞ্চলের ওঁরাও বসতির কথা জানা যায়। ধামইরহাট থানার জগন্নাথপুর নিবাসী ব্যাঙা ওঁরাও সচ্ছল ব্যক্তি। মুন্ডা-পাহানদের তুলনায় নওগাঁ জেলায় ওঁরাওদের অবস্থা কিছুটা ভাল। এদের মধ্যে দুচারজন শিক্ষিত লোক পাওয়া যায়। কিন্তু বেশির ভাগই বেশ গরীব। দু-চারজন মাত্র দু-তিন বিঘা জমির মালিক। নারী পুরুষ সকলেই ক্ষেত খামারের কাজে মজুর খাটে।

 

চাঁদের তিথি অনুসারে ভাদ্র বা আশ্বিনে অনুষ্ঠেয় ডালপূজা ওঁরাওদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। পাহান-মুন্ডারের মতো প্রায় একই নিয়মে ওঁরাওরা ডালপূজা করে। পাড়ার সকলে মিলে বারায়ারি পূজার মতো করে এই পূজা দেয়। প্রথমে খেলা’তে অর্থাৎ বহিরাঙ্গনে একটা ‘থান’ বা বেদী তৈরি করা হয়। একজন অবিবাহিত যুবক পাতা সহ খেল-কদম্বের ডাল কেটে আনে। সেই ডাল বেদীতে পোতা হয়। পাড়ার প্রবীণ ব্যক্তি এই পূজা করেন। সন্ধ্যার পর মোটামোটি রাত ৮টার দিকে পূজা শুরু হয়। তিনটি ডালায় করে ধুপ, সিঁদুর, খাগড়াই, বাতাসা, বড়া, শশা, কলা, রক্তহলা, থানের পাতা, ধান, মাসকলাই, যব, নদীর বালি এসব এনে তিন ব্যক্তি ডালের গোড়ায় উৎসর্গ করে। যারা উৎসর্গ করবে তাদের উপবাস থাকতে হয়। তিন উপবাস না করতে পারলে দুজন বা একজনও ডালা উৎসর্গ করতে পারে। ডালা উৎসর্গ করার সময় উপস্থিত মেয়েরা উলু দেয়। পূজার সময় ছেলেমেয়েরা বেদীর চারিদিকে ঘিরে বসে থাকে। তাদের থালায় থাকে প্রদীপ, রুটি, দুর্বাঘাস, আতপ চাল ইত্যাদি। ডালা উৎসর্গ করার পর পূজারী ‘কর্ম-ধম’র্র গল্প শুরু করেন। গল্পের এক পর্যায়ে পূজারী সবাইকে ধর্মের গাছ ধরতে বললে সবাই উলু ধ্বনি দিয়ে ওই গাছ ধরে। তারপর ছেড়ে দিয়ে আবার নিজ নিজ স্থানে গিয়ে বসে। গল্পের আর এক পর্যায়ে পূজারী সবাইকে বসার পিঁড়ি উল্টে ধরতে বলেন। ডালা উৎসর্গকারী তিন উপবাসীসহ সবাই পিঁড়ি উল্টে ধরলে পূজারী জানতে চান, পিঁড়ি উল্টে কি পাওয়া গেল? কেউ বলে বেটা পেয়েছি, কেউ বলে বেটি পেয়েছি। গল্পের আর এক পর্যায়ে পূজারীর নির্দেশে তিন উপবাসী ডালে ফুল-জল ছিটিয়ে দেয়। গল্প শেষ করে পূজারী ডালি থেকে অর্ঘ্য নিয়ে ডালের গোড়ায় নিবেদনের পর উঠে পড়ে। তিন উপবাসীও উঠে পড়েন। পূজা শেষ। উৎসর্গ করা পিঠা নিয়ে পূজারী বাড়ি চলে যেতে পারেন। এবার যার যার থালা থেকে রুটি ইত্যাদি বিতরণ করা হয়। এর পর নাচ গান। কয়েকজন ছেলে বুড়ো ঢোল, মাদল জুড়ি করতাল বাজায় আর বাদ্যের তালে তালে একদল ছেলে ও একদল মেয়ে কখনো মুখোমুখি কখনো পাশাপাশি নাচগান শুরু করে দেয়। ওঁরাও সম্প্রদায় নিজেদের বিচার নিজেরাই করে। কোর্ট কাচারির ধার ধারেনাৎ। কারও মৃত্যু হলে মৃতের গায়ে থাকা পুরাতন কাপড়ের উপর নতুন কাপড় পরানো হয় এবং মাটিচাপা দিয়ে সমাধিস্থ করা হয়। অবশ্য পোড়ানোও যায়। রোগ নিরাময়ের জন্য ওঁরাওদের নিজস্ব চিকিৎসক ও চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে। তারা প্রধানত মন্ত্র চিকিৎসা ও কবরাজি চিকিৎসার মুখোপেক্ষী । ওঁরাওগণ দ্রাবিড় ভাষার অমত্মর্গত কুরুখ ভাষায় কথা বলে।

 

 

(৪) মহালী বা মাহালী

 

আদি অস্ট্রেলীয় জনগোষ্ঠীর অমত্মর্গত মহালীরা বাংলার প্রধান কয়েকটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের অন্যতম। নওগাঁ জেলার পত্নীতলা থানায় ১৫০টি মহালী পরিবার বসবাস করে । এছাড়া, পোরশা, মান্দা, ধামইরহাট ও বদলগাছি থানায় মহালীরা বাস করে। এরা প্রায় সকলেই খ্রিস্টান। বাঁশ ও বেতের কাজ করে মহালীরা জীবিকা নির্বাহ করে। খুব কম সংখ্যক মহালীরই দু’এক বিঘা জমি আছে।

 

 

(৫) বাঁশফোঁড়

 

নওগাঁ জেলার মধ্যে নওগাঁ শহরের তরকারি বাজার সংলগ্ন পল্লীতেই সর্বাধিক সংখ্যক বাঁশফোঁড় বসবাস করে। এ ছাড়া মহাদেবপুর, সাপাহার, হাপানিয়া, নজিপুর, পত্নীতলা, মাতাজি হাট, ধামইরহাট এবং স্বরসতীপুর বাজারে কিছু বাঁশফোঁড় বাস করে। এদের সংখ্যা পাঁচ-ছয়শতের বেশি হবেনা। বাঁশফোঁড়দের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে প্রধান হচ্ছে কালিকা পূজা ও সূর্য পূজা। বাঁশফোঁড়দের কালিকা দেবী হিন্দুদের কালিদেবী থেকে পৃথক। বাঁশফোঁড়রা বেশির ভাগ ঝাড়ুদারের  চাকুরি  করে। এদের জমি জমা বা শিক্ষা দীক্ষা  তেমন নেই। বাঁশফোঁড়রা ভাঙ্গা হিন্দি ভাষায় কথা বলে। বাংলা ভালোই বলতে পারে।

 

 

(৬) কুর্মি

 

নওগাঁ জেলার ধামইরহাট, মহাদেবপুর, পত্নীতলা ও বদলগাছি থানায় কুর্মিরা বসবাস করে। নওগাঁ জেলার অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের তুলনায় কুর্মিরা বেশ অগ্রসর। ১৯৪৭ এর পরে কর্মিরা ব্যাপক হারে দেশ ত্যাগ করে। মুন্ডা ও ওঁরাওদের মতো কুর্মিরাও ডাল পূজা করে এবং এটিই তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব।

 

 

(৭) মাল পাহাড়িয়া

 

নওগাঁ জেলার পত্নীতলা থানায় ১০৫ঘর, পোরশা থানায় ১৫৩ঘর, সাপাহার থানায় ২০ঘর, মান্দা থানায় ১২ঘর, মহাদেবপুর থানায় ৫ঘর এবং নিয়ামতপুর থানায় ৫০ঘর মাল পাহাড়িয়া বাস করে। মাল পাহাড়িয়ারা অত্যমত্ম গরীব। পেশা দিনমজুরী। নারী পুরুষ সবাই ধান রোপন, কাটা ইত্যাদি মাঠের কাজ করে থাকে। শ্রাবণ সংক্রামিততে হাঁস উৎসর্গ করে মনসা পূজা মাল পাহাড়িয়াদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান। মাল পাহাড়িয়া সম্প্রদায় নিজেদের মধ্যে সামাজিক শৃঙ্খলা বিধান করে এবং মোটামোটি শান্তিতে বসবাস করে। আইন আদালতের আশ্রয় নেয়ার দরকার হয়না

 

 

 

1.পর্যটন

 

 

পর্যটনের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা না থাকলেও ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ সহানের নিক দিয়ে নওগাঁ জেলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলায় অবসিহত ধূসর পাথর দ্বারা নির্মিত কুসুমবা মসজিদ, বদলগাছী উপজেলায় এশিয়ার বৃহত্তম বৌদ্ধ বিহার, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, হলুদ বিহার, ধামইরহাট উপজেলায় অবসিহত ভীমের পান্টি, মাহিসন্তোষ, আলতাদীঘি ও জগদলবাড়ি, আগ্রাদ্বিগুন পুরাকীর্তির ধ্বংসাবশেষ, পত্মীতলা উপজেলায় অবসিহত দিব্যক জয়স্তম্ভ, নওগাঁত সদর উপজেলায়দুবলহাটি জমিদার বাড়ি ও বলিহার রাজবাড়ি এবং আত্রাই উপজেলায় অবসিহত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি  বিজড়িত পতিসর কুঠিবাড়ি অবস্থিত ।

 

  

 

চিত্র সংগ্রহ ও সংযোজন: ড. মোজাফফর আহমেদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), নওগাঁ। তারিখ: ১লা জানুয়ারী  ২০১০

 

 

এই সকল ঐতিহাসিক সহানসমূহে পর্যটন মটেল সহাপন , বিদ্যুৎ সরবরাহ, টেলিফোন সংযোগ এবং যোগাযোগ ব্যবসহার আধুনিকীকরণ করে পর্যটকদের আকৃষ্টকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব ।

 

 

2. শিল্প

 

নওগাঁ জেলা শিল্পের দিক দিয়ে একেবারেই পশ্চাদপদ। এখনও এই জেলায় ভারি বা মাঝারি কোন শিল্প গড়ে উঠেনি। এই জেলায় সড়ক ও রেলপথে দেশের যে কোন সহানের সংগে যোগাযোগের সুযোগ থাকায় এবং পর্যাপ্ত জনশক্তি, বিদ্যুতের সরবরাহ থাকায় এখানে ভারি ও মাঝারি শিল্প সহাপনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে ।

এই জেলায় বৃহদাকারের কয়েকটি স্বয়ংক্রিয় চাউল কল ছাড়াও ধান সিদ্ধ করার বয়লার, পস্নাষ্টিক মোল্ডিং কারখানা, কলম প্রস্ততকারী কারখানা,  চিড়াকল, বেকারী ইত্যাদি ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে উঠেছে । এছাড়া জেলা সদরে সহাপিত বিসিকি শিল্পনগরীতে বর্তমানে কিছু ক্ষুদ্র/মাঝারি শিল্প গড়ে উঠেছে । জেলার উদ্দোক্তাগণ ট্রেডিং এর প্রতি আগ্রহী। তাদের ম্যানুফ্যাকচারিং এর প্রতি উৎসাহী করে তুলতে হবে । এই জেলা ফল প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, ডেয়ারী সহাপনের জন্য স্বচ্ছল উদ্যোক্তাদের উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন ।

 

 

নওগাঁর অটোমেটিক রাইস মিল:

 

নাদিয়া ফুড এন্ড এগ্রোঃ ইন্ডাঃ প্রাঃ লিঃএকটি সর্বাধুনিক -সয়ংক্রিয় আর্ন্তজাতিক মানের চাউল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকোম্পানীর নামঃ নাদিয়া ফুড এন্ড এগ্রোঃ ইন্ডাষ্ট্রিজপ্রাঃ লিঃ (বেলকন গ্রুপের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান)। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকঃ জনাব মোঃ বেলাল হোসেন । উৎপাদিত চালৈর ব্রান্ডের নামঃ রজনীগন্ধা

 

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে চাউল আমাদের প্রধান খাদ্য । বিশাল এই জনগোষ্ঠিকে সুলভ মুল্যে মান সম্মত চাউল সরবরাহ করাই এর মুল লক্ষ্য । এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমরা আমাদের উৎপাদিত চাউল সমগ্র বাংলাদেশে বাজারজাত করে আসছি । এমনকি আমাদের রজনীগন্ধা চিনিগুড়া আতব চাউল বিদেশে রপ্তানী হয় ।

 

  

চিত্র সংগ্রহ ও সংযোজন: ড. মোজাফফর আহমেদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), নওগাঁ। তারিখ: ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১০

 

ব্যবহৃত কাঁচামালঃ বিভিন্ন জাতের উন্নতমানের বাছাইকৃত ধান

উৎপাদিত পন্যের নামঃ বিভিন্ন ধরনে উন্নতমানের সটিংকরা চাউল, যেমন-মিনিকেট, নাজির শাইল, কাটারী

ভোগ, পাইজাম, রঞ্জিত , মোটা ও স্বর্না চাউল। এছাড়া রজনীগন্ধা ব্র্যান্ডের উন্নত মানসম্পন্ন চিনিগুড়া আতব

চাউল ও মুড়ির চাউল ।

উৎপাদন ক্ষমতাঃ ১৪মেঃ টন প্রতি ঘন্টায় (মিলটি ৩ শিফটে উৎপাদন করে) ।

 

উৎপাদিত চাউল কেন উৎকৃষ্ট :

১। চাউল উৎপাদনের ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ।

২। কারিগরী প্রযুক্তি ব্যবহার করিয়া সঠিকভাবে চাউলের মান নিয়ন্ত্রন ।

৩। আমাদের উৎপাদিত চাউলের ওজন সঠিক থাকে ।

৪। উৎপাদিত চাউল রান্নার পর দীর্ঘক্ষন ভাতের মান অক্ষুন্ন থাকে । কোন রকম দুর্গন্ধ হয়না ও ঘামায় না ।

 

তাই আসুন আমরা যখনই চাউল কিনি দেশে উৎপাদিত ও প্রত্রিয়াজাতকৃত রজনীগন্ধা চাউলের কথা চিন্তা করি এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করি ।

 

  

চিত্র সংগ্রহ ও সংযোজন: ড. মোজাফফর আহমেদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), নওগাঁ। তারিখ: ১৩ ফের্রুয়ারী ২০১০

 

যোগাযোগঃ ব্যবস্থাপনা পরিচালকঃ জনাব মোঃ বেলাল হোসেন এবং জেনারেল ম্যানেজার (প্রোডাকশন ও মার্কেটং) মোবাইলঃ ০০৮৮-০১৭১৩-২০১০৯৭, ০১৭১১-১৭৬৫০৬, ০১৭১৭-০৫৬০৮৮

 

ঠিকানাঃ ফ্যাক্টরী- সান্তাহার রোড, নওগাঁ  হেড অফিসঃ আলুপট্টি, পার-নওগাঁ, নওগাঁ । ঢাকা অফিসঃ বি-১৭১, রোড নং-২৩, নিউ.ডি.ও.এইচ এস,  মহাখালী, ঢাকা -১২১২ ।  ফোনঃ ০৭৪১-৬২৩৬৪,৬৯৪৬৯, ফ্যাক্সঃ ০৭৪১-৬৯৬৬৬,৬১৯৪৯  ই-মেইলঃ bhbelcon@yahoo.com    ওয়েবঃwww.bhbelconbd.com

 

 

3. ধরমপুর মসজিদ

 

 

নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার ভাবিচা ইউনিয়নের ধরমপুর গ্রামে মোগল শাসনামলে একটি মসজিদের সন্ধান পাওয়া গেছে । এটিতে নয়টি গমবুজ ছিল বলে  প্রত্নতাত্ত্বিকেরা অনুমান করেন। এই মসজিদের উত্তর  পূর্ব ও দিক্ষণ দেওয়ালে তিনটি করে খিলান করা দরজা ছিল। আর পশ্চিম দেওয়ালে তিনটি খিলান করা মিহরাব ছিল। দু’সারিতে অবসিহত চারটি ইট নির্মিত বৃহদাকার চারটি স্তম্ভ মসজিদের অভ্যন্তর ভাগকে তিনটি আইল বা খিলান পথ এবং তিনটি ব্যে বা হ্রস্বপথে বিভক্ত করেছে। স্তম্ভের উপরিভাগে ঝুলন্ত খিলানের দেওয়ালের বর্হিভাগে অতি সুন্দর প্যানেলের কারুকাজ লক্ষ্যকরা যায়। ধরমপুর মসজিদে চারটি শিলালিপি পাওয়া গেলেও কোন লিপির সম্পূর্ণ পাঠ উদ্ধার সম্ভব হয়নি। একটি লিপির আংশিকভাবে পাঠাদ্ধার সম্ভব হয়েছে। সে লিপি থেকে জানা যায় যে, ১১১১ হি./১৬৯৯-১৭০০ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। মসজিদের দৈর্ঘ ৪২  ও প্রসহ ৪২ ফুট। দেওয়াল ২ ফুট ৬ ইঞ্চি চওড়া। চুন-সুড়কির গাঁথুনি। মসজিদের ভিতরের ৪ টি কলাম,মসজিদের চার কোনায় ৪টি কলাম অতি সুন্দর অংকরণ বিশিষ্ট। মজার ব্যাপার যে এই মসজিদের একই চত্ত্বরে একটি মন্দির ও একটি তাজিয়া আছে ।

 

 

4. কয়েটি মুসলিম ঐতিহাসিক নিদর্শন

 

 

কুশুমবা মসজিদ, মাহীসন্তোষ ও ধরমপুরের ধ্বংসপ্রাপ্ত ইমারত ছাড়াও নওগাঁর বিভিন্ন থানায় দু’ থেকে চারশ বছরের পুরাতন বহু মসজিদ, দরগা, এমনকি দু’একটি তাজিয়াও আছে। তবে এগুলি অযত্নে ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

আত্রাই থানার মহাদীঘি গ্রামের মসজিদ, কাজীগাড়া গ্রামের মসজিদ ও তাজিয়া, মিরাপুর গ্রামের মসজিদ উল্লেখযোগ্য। নিয়াতপুর থানার পাইকর গ্রামে রয়েছে একটি পুরাতন মসজিদ, মিহান্দা গ্রামে তিন গমবুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ, শালবাড়ি গ্রামে তিনশত বছরের  পুরাতন একটি দরগা এবং রামকুড়া গ্রামে একটি তাজিয়া, মান্দা থানার চরমান্দারিশ গ্রামে তিনশত বছরের পুরাতন একটি দরগা আছে। পত্মীতলা থানার কৃষ্ণপুর গ্রামে তিনশত বছরের পুরাতন একটি মসজিদ এবং মধইল গ্রামে প্রায় চারশত  বছরের পুরাতন একটি দরগার ধ্বংসাবশেষ আছে। বদলগাছী বাজারে উত্তর দিকে শাহবুদ শাহ নামে একজন আউলিয়ার মাজার আছে। তবে তিনি কোন্ সময় এখানে এসেছিলেন, কতদিন জীবিত ছিলেন তা কেউ বলতে সক্ষম নয়।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, উপরোক্ত মসজিদ-দরগার বয়স আনুমানিক আর মসজিদ মন্দিরের বিবরণ যে চুড়ান্ত তা বলা যাবে না। কারণ এই নওগাঁ শহরের উত্তরে কোমাইগাড়ী গ্রামের পাশে তিন গমবুজ বিশিষ্ট একটি ছোট পুরাতন মসজিদ আছে। দৈর্ঘ ২৩ ফুট ও প্রসহ মাত্র ৫ ফুট। একসারি লোকের নামাজের সহান সংকুলান হতে পারে। এর নির্মাণ কাল নির্ণয়  করা দুরুহ। সহানীয় লোকেরা কেউ সঠিক তথা দিতে পারে না । অনুরুপভাবে নওগা থানার বালুভরায় একটি পিরামিডাকৃতি সুন্দর মন্দির আছে। এটি যে কতকাল আগে নির্মিত তার সঠিক তথ্যও পাওয়া যায় না ।

 

 

5. বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ

 

 

নওগাঁ জেলার অধিকাংশ বরেন্দ্র এলাকাভূক্ত হওয়ায় তৎকালীন সরকার ১৯৮৫ সালে কৃষি, সেচ তথা সমন্বিত  উন্নয়নের মাধ্যমে এখানকার অধিবাসীদের আর্থ-সামাজিক অবসহার উন্নয়নে ৫ বৎসর ব্যাপী বরেন্দ্র সমন্বিত এলাকা উন্নয়ন প্রকল্প- ১ম পর্যায় গ্রহণ করে। এই প্রকল্পটি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয় । ১৯৯০ সালে উক্ত প্রকল্পের মেয়াদ শেষে ২য় পর্যায়ের কাজ শুরু হয় ।১ম পর্যায়ে প্রকল্পের বিস্তৃতি ১৫ টি থানা থেকে বৃদ্ধি করে রাজশাহী , নওগাঁ ও নবাববগজ্ঞ জেলার সবকটি থানা অর্থাৎ ২৫টি থানাকে প্রকল্পভূক্ত করায় এই প্রকল্পের কাজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ’বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ নামে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষতত্ত্বাবধানে রাজশাহীতে সদর দপ্তর করে একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান গঠিত হয় । এই প্রতিষ্ঠান বরেন্দ্র সমন্বিত এলাকা উন্নয়ন প্রকল্প-২য় পর্যায়সহ প্রকল্পভূক্ত এলাকার সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায়।

 

 

6. গাঁজা সোসাইটি

 

 

নওগাঁ জেলার অর্থনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এই জেলার নওগাঁ সদর, মহাদেবপুর ও বদলগাছী থানায় বৃটিশ আমলে গাঁজা চাষ হত। গাঁজা চাষের জন্য এই এলাকার মাটি উপযোগী হওয়ায় প্রায় ৯,০০০ হেক্টর গাঁজা চাষের আওতাভূক্ত করা হয়। প্রায় একশ বছর ধরে নওগাঁ থানার তিলকপুর, বোয়ালিয়া, বক্তারপুর, কীর্তিপুর, নওগাঁ , হাঁপানিয়া, বর্ষাইল, দুবলহাটি, বদলগাছী থানার বালুভরা, মহাদেবপুর থানার ধনজইল ও ভীমপুর এলাকায় গাঁজা চাষ হত। এই তিন থানা পৃথক জেলার অধীনে  থাকায় ১২০ বছর পূর্বে গাঁজা চাষের সুবিধার্থে এই তিন থানাসহ অন্যান্য থানার সমন্বয়ে রাজশাহী জেলার অধীনে নওগাঁ মহকুমা গঠিতত হয়। তৎকালীন রাজশাহী জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পদাধিকারবলে গাঁজা সোসাইটির চেয়ারম্যান, বহকুমা প্রশাসক ভাইস চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করতেন। বৃটিশ সরকার গাঁজার দাম নির্ধারণ করে দিলেও গাঁজা চাষীরা লাভ হতে বঞ্চিত হত না । গাঁজার মত আর কোন ফসল এত লাভও হত না। তাই নওগাঁ গাঁজা মহালের চাষীরা তৎকালীন বৃটিশ ইন্ডিয়ার সব থেকে স্বচ্ছল চাষী বলে গণ্য হতেন। গাঁজা সোসাইটির অফিস ভবন ও স্টাফ কোয়ার্টার ছিল নওগাঁ শহরের প্রথম দিককার সহাপনা। ভবনগুলোকে কেন্দ্র করে নওগাঁ শহরের গোড়াপত্তন হয়। গাঁজা সোসাইটির অবদানকে বাদ দিলে নওগাঁর অর্থনৈতিক ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায় ।

 

  

চিত্র সংগ্রহ ও সংযোজন: ড. মোজাফফর আহমেদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), নওগাঁ। তারিখ: ১০ মার্চ  ২০১০

 

 

বৃটিশ সরকার নওগাঁর গাঁজা উৎপাদকদের কাছ থেকে বৎসরে ৬৬ লক্ষটাকা রাজস্ব পেত। যা সরকারের রাজস্বের প্রধানতম উৎস বলে পরিগনিত হত। গাঁজা চাষীদের প্রতিষ্ঠান ’দি নওগাঁ গাঁজা গ্রোয়ার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিঃ’ সংক্ষপে গাঁজা সোসাইটি এতদাঞ্চলের শিক্ষা, স্বাসহ্য, পশুকল্যাণ, যোগাযোগ ব্যবসহার উন্নয়নে প্রধান ভূমিকা রাখত। নওগাঁ শহরের গুরুত্বপূর্ণ সহান অবসিহত এই সোসাইটির সম্পত্তিগুলোর সুষ্ঠু ব্যবসহাপনা করা হলো সোসাইটি তাঁর সস্যদের আর্থ সামাজিক অবসহার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধন করতে সক্ষম হবে ।

 

 

নওগাঁ কে,ডি,সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়

 

1| প্রতিষ্ঠানের পুরো নাম ও ঠিকানা:নওগাঁ কে,ডি, (কৃষ্ণ ধন) সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়, নওগাঁ,

মহল্লা- খাস নওগাঁ, ডাকঘর- নওগাঁ, উপজেলা- নওগাঁ সদর

জেলা- নওগাঁ। ফোন: ০৭৪১-৬২৮৮৭

2| প্রতিষ্ঠার তারিখ:২৪/০২/১৮৮৪ ইং।

 

3| প্রতিষ্ঠার বিবরণ:১৮৭৭ খ্রীষ্টাব্দ সৃষ্ট ৩৪৩৫.৬৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট উত্তরবঙ্গের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহকুমা শহর এই নওগাঁ মহকুমা, কৃষি সম্পদে সমৃদ্ধ ও জমিদার প্রধান স্থান হিসাবে খ্যাত কিন্তু শিক্ষা বিস্তারে উদাসীন, এমনই এক পরিবেশে নওগাঁ মহকুমা শহরে ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দে মহকুমার সর্বপ্রথম এই হাই স্কুল স্থাপিত হয়। নওগাঁর এই স্কুল স্থাপনে প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন নওগাঁর তদানিন্তন ডেপুটি ও গাঁজা সোসাইটির সুপার ভাইজার বাবু কৃষ্ণ ধন বাগচী। তাঁর প্রচেষ্টায় নওগাঁ মহকুমার জামিদার, বিত্তশালী লোক ও কৃষকগণ স্কুলটি প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। এই স্কুল শুরু হয়েছিল খড়ের আটচালা ঘর দিয়ে, বাবু কৃষ্ণ ধন বাগচীর মৃত্যুর পর সম্রাট পঞ্চম জর্জের রাজ্যাভিষেকের সংগৃহীত অর্থের উদ্ধৃতাংশ ও স্থানীয় জনগণের চাঁদার সাহায্যে স্কুলের সম্প্রসারণ কাজ সমাপ্ত করে স্কুলটির ইংরেজি Hঅক্ষর আকারে পাকা একতলা ভবন নির্মান করা হয়। ১৯৭০ খ্রীষ্টাব্দের পহেলা ফেব্রুয়ারী বিদ্যালয়টি সরকারী মযাদা লাভ করে।

4| বিদ্যালয়ের প্রসিদ্ধ প্রাক্তন শিক্ষক ও ছাত্র:রত্নগর্ভ নওগাঁ কে.ডি.সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় একটি বিশাল বিটপী সমতুল্য। কত শত জ্ঞানী গুনীজন শিক্ষকতা ও জ্ঞানার্জনের সোনালী অধ্যায় এই মহাতীর্থ ক্ষেত্রে সমাপ্ত করেছেন তা এই স্বল্প পরিসরে উল্লেখ করা সম্ভব নয়, তন্মধ্যে কিছু স্মৃতি নিম্নরূপঃ বাবু কুমুদনাথঅত্র স্কুলের ইংরেজী গদ্য ও বাংলার শিক্ষক ছিলেন। তিনি একজন সু-সাহিত্যিক হিসেবে ইংরেজী ও বাংলা উভয় ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেন। তাঁর রচিত A History of Bengali Literature Rabindranath His Mind and Art, জিজ্ঞাসা, কাব্যগুচ্ছ প্রভৃতি গ্রন্থ সুধীমহলে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করে। তাঁর A History of Bengali Literatureনামক সাহিত্য সমালোচনা গ্রন্থটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনুসরণীয় গ্রন্থ হিসেবে মনোনীত হয়েছিল। ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ প্রণেতা পন্ডিত শরৎচন্দ্র কাব্যরত্নছিলেন স্কুলের হেড পন্ডিত। তাঁর কাব্য চর্চার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে কাব্যরত্ন উপাধি দেওয়া হয়। এই হেড পন্ডিত মহাশয় পরে অধ্যাপনা করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর ছোট ভাই বাবু সতীশ চন্দ্র বিখ্যাত অধ্যাপক ও যশস্বী সাহিত্যিক কলকাতা কলেজের অধ্যক্ষ মহাপাধ্যায় সতীশ চন্দ্র আচার্য বিদ্যাভূষণ এম,এ,পি এইচ, ডি, ও এই স্কুলের শিক্ষকতা পেশায় নিবেদিত ছিলেন।

 

  

wPÎ msMÖn I ms‡hvRb: W. †gvRvddi Avn‡g`, AwZwi³ †Rjv cÖkvmK (ivR¯^), bIMvu| ZvwiL: 27 ‡diª“qvix 2010

 

 

বাংলা ও ইংরেজি এ দুটি ভাষায় এম,এ ডিগ্রী নিয়েও (সম্ভবত ১৯৪৫ সালে) এই স্কুলের শিক্ষকতা করেছেন। সরলতম জীবন যাপনকারী শ্রীচরণ বসাক। তিনি বেতনের টাকা পেয়েই পাবনার অনুকূল ঠাকুরের কাছে পাঠাতেন। ঠাকুর মশায় তাঁর আশ্রমের জন্য চাঁদা রেখে শ্রী বসাককে যা পাঠাতেন তা দিয়েই তিনি সংসার চালাতেন। জাগতিক বৈষয়িক হিসেবের সূক্ষ্ম বিবেচনার উর্দ্ধে থেকে কিভাবে নিজেকে জ্ঞান বিতরণের সেবায় অধিকতর উৎসর্গী হওয়া যায়। সেই উৎকৃষ্ট উদাহরণ তাঁর জীবন চিত্র থেকে সহজেই অনুমেয়।

জনাব এমরান আলী (১৯৫৪-১৯৫৯)স্যার ছিলেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী ধ্বনিতত্ত্বে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এম,এ প্রথম শ্রেণীর গোল্ড মেডেলিস্ট। তিনি এই স্কুল থেকেই লন্ডনে গিয়ে ধ্বনি তত্ত্বের উপর বিশেষ পাঠ গ্রহণ করেন এবং ছাত্রদের মাঝে তাঁর লব্ধ জ্ঞানের বিশেষ চর্চায় নিবেদিত থাকেন।

জনাব মুজিবুর রহমান (১৯৬০-১৯৭৮) প্রশাসনিক বিচক্ষনতা ও দূরদর্শিতার এক মূর্তমান প্রতীক। তিনি ১৯৬১-৬২ সালে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রশিক্ষণ কোর্সের পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করায় ১৯৬৫-৬৬ সালে স্কুল পরিচালনা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আমন্ত্রণে ফুলব্রাইট স্কলারশীপ নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন এবং স্কুলকে একটি আদর্শ বিদ্যাপীঠে পরিণত করতে নিবোদিত সেবকের ভূমিকা পালন করেন। তাঁর রচিত ‘নওগাঁ কে,ডি,স্কুল পরিচিতি’ পুস্তিকা অত্র স্কুলকে জানার ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক।

জনাব আলতাফ হোসেন (১৯৫৬-৭৯, ৮১-৯১) প্রজ্ঞা, দক্ষতা ও প্রশাসনিক শৃংখলা বজায় রেখে স্কুলের সমস্ত কার্যক্রমকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করে একে সুনামের চরম শিখরে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টার কোনরূপ ক্রটি রাখেননি। শিক্ষক প্রশিক্ষন কোর্সের পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করায় ১৯৬৬-৬৭ সালে স্কুল পরিচালনা বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আমন্ত্রণে ফুলব্রাইট স্কলারশীপ নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন এবং বিদ্যালয়ের সার্বিক সফলতার নিদর্শন স্বরূপ তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষকের স্বীকৃতি দেওয়া হয় ১৯৯২ সালে।

এই স্কুলের ছাত্র মরহুম হুমায়ন কবির (১৯০৬-১৯৬৯) ১৯২২ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজশাহী বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, বাগ্মী ও রাজনীতিবিদ (সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক-আবু সয়ীদ আইয়ুব এর সাথে চতুরঙ্গ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন) ছিলেন। তাঁর বাংলা কাব্য, নদী ও নারী উপন্যাস এবং শরৎচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় এর উপর গবেষণা কাজ বৈজ্ঞানিক যুক্তিনিষ্ঠার এক অপূর্ব দলিল। তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পেট্রোলিয়াম ও কেমিক্যালস্ দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন (১৯৬৩-৬৮)। তাঁর ইংরেজী ও বাংলায় লেখা দর্শন, সাহিত্য, রাজনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রায় ২০টি গ্রন্থ রয়েছে। তিনি মওলানা আজাদের সচিব ছিলেন।

 

পৃথিবী খ্যাত রাজনৈতিক গ্রন্থ মওলানা আজাদের ‘India Wins Freedom’ এর ইংরেজী খসড়ার প্রণেতা ছিলেন হুমায়ন কবির এবং এই মহা মূল্যবান গ্রন্থের বাংলায় অনুবাদক দক্ষিণ এশিয়ার প্রখ্যাত প্রগতিপন্থি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও-এই স্কুলেরই এক সমযের ছাত্র ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র-যারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শহীদ হন তাঁরা হলেনঃ- নজমুল হক, কুদরত-ই-এলাহী, আবদুল্লাহ আল মামুন, কাজী নূরুন নবী, ইদ্রিস আলী, মতিউল ইসলাম, ইব্রাহিম আলী, জয়নাল আবেদীন, সানাউল্লাহ, হিম্মত আলী ও আব্দুর রাজ্জাক। 

5| স্থানীয় উন্নয়নে বিদ্যালয়ের ভূমিকা: স্থানীয় তথা দেশের উন্নয়নে বিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্ররা যথেষ্ট ভূমিকা রাখেন এবং রাখছেন।

6| রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আন্দোলনের ভূমিকা: এই বিদ্যালয়েরই প্রাক্তন ছাত্র, নওগাঁর কৃতি সন্তান জনাব মোঃ আব্দুল জলিল মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। তিনি আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও প্রাক্তন বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে দেশ গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। মরহুম শামসুদ্দীন আহমেদ এম,পি বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন রাজা চৌধুরী, মমিনুল হক (ভুটি ভাই)। জনাব লোকমান হাকিম ফতু বিটিভির সুরকার হিসেবে ৩ বার জাতীয় পুরস্কার পান। সত্যাগ্রহ আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, দেশ ও কৃষ্টি আন্দোলন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে এই স্কুলের সন্মানিত শিক্ষক কর্মচারী ও ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এই স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন, কাজী সাখাওয়াত হোসেন, নুরউল হক, তৌহিদ আহমেদ, আতাউল হক সিদ্দীকি, মতি নন্দ রায়, মুকিম উদ্দিন, হামিদুর রহমান, আব্দুস সালাম অন্যতম।

7| ছাত্র, শিক্ষকের সংখ্যা, আর্থিক অবস্থা, ভৌত অবকাঠামোগত অবস্থা : বর্তমানে বিদ্যালয়ের মোট জমির পরিমান ১২ একর, ৫টি খেলার মাঠ, ৩টি হোস্টেলের মধ্যে বর্তমানে স্কুল ক্যাম্পাসে ১টি হোস্টেল চালু আছে। এছাড়াও অডিটোরিয়াম, দ্বিতল বিজ্ঞান ভবন, সমৃদ্ধ লাইব্রেরী, স্কাউট ভবন, শহীদ মিনার, মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিফলক রয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ে শিক্ষক সৃষ্টপদ সংখ্যা (ডবল শিফ্ট) মোট ৫২টি, ৩য় থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতিটি শিফ্টে প্রতিটি শ্রেণীতে ২টি করে শাখা চালু আছে এবং ৯ম ও ১০ম শ্রেণীতে বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগ চালু আছে। সর্বমোট ছাত্র সংখ্যা ১৩২০ জন (প্রায়)। বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান যথেষ্ট ভাল, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অবস্থান, চারুকলা, কম্পিউটার বিজ্ঞান, শরীর চর্চা বিষয়ে শিক্ষাদান সফলভাবে চালু আছে এবং বিদ্যালয়ে এসবিএ পদ্ধতি চালুসহ প্রাথমিক বৃত্তি, জুনিয়র বৃত্তি এবং এস,এস,সি পরীক্ষার ফলাফল বেশ সন্তোষজনক। এই প্রতিষ্ঠানটি অত্র জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় বহন করে।

তথ্য সংগ্রহ ও সংকলনেঃজনাব মোঃ আল মামুন সহঃ শিক্ষক (ইংরেজি), নওগাঁ কে,ডি,সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়, নওগাঁ।

 

 

 

 

নওগাঁ জিলা স্কুল, নওগাঁ।

 

প্রতিষ্ঠিাঃ ১৯১৭ সাল( প্রথমে ইংরেজি স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়)

প্রতিষ্ঠাতাঃ সম্রাট পঞ্চম জর্জ।

নওগাঁ জিলা স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ঃ ১৯৮৫ সালে।

প্রতিষ্ঠাতাঃ সাবে্ক প্রেসিডেন্ট জনাব হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। ফোন: ০৭৪১-৬২৩০২

 

 

 

 

  

 

 

শ্রেণী ভিত্তিক ছাত্রের সংখ্যাঃ বর্তমানে বিভিন্ন শ্রেণততে মোট  ৯০০জন ছাত্র আছে।

 

ফলাফলঃ এস, এস, সি- ২০০৯ এ মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১৬১ জন, মোট পাস ১৫৩ জন পাসের হার ৯৫.০৩% জি.পি.এ- ৫ প্রাপ্তির সংখ্যা ২৮ জন । জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা- ২০০৮ এর ফলাফলঃ মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৪২ জন সাধারণ বৃত্তির সংখ্যা ০৯ জন প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা- ২০০৯ এর ফলাফলঃ পাসের হার১০০% মেধা বৃত্তির সংখ্যা ০৩ টি, সাধারণ বৃত্তির সংখ্যা ০২ টি।

 

জুনিয়র এবং প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার অসাধারণ সাফল্য এবং এস, এস, সি পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক। লেখাপড়ার পাশাপাশি স্কাউটিং, খেলাধুলা এবং জাতীয় বিজ্ঞান মেলায় পরীক্ষার্থীরা অসাধারণ সাফল্য রাখে। প্রতিষ্ঠানটি জেলা একটি কে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান হিসাবে সমাদ্রিত ।

 

 

 

উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী জামিয়ার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:

 

 

 

নাম:আল জামিয়াতুল আরাবিয়া দারুল হিদায়াহ্ ,পোরশা ,নওগা ,বাংলাদেশ ।

স্থাপিত:১৩৫৩ বঙ্গাব্দ মোতাবেক ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দ ১৩৬৬ হিজরী ।

প্রতিষ্ঠাতা :মরহুম আব্দুল হাই শাহ চৌধুরী ।

প্রথম পরিচালক :মাওলানা সালিহ আহমাদ সাহেব (দা:বা:)

জামিয়ার বর্তমান মহাপরিচালক :আলহাজ্ব হযরত মাওলানা শাহ্  মুহাম্মাদ শরীফুদ্দীন চৌধুরী ।

জামিয়ার আয়তন :তিন একর ।

অবস্থান :নওগা জেলার অন্তর্গত পোরশা থানাধীন পোরশার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ।

বর্তমান ছাত্রসংখ্যা :৯০০জন প্রায় ।

শিক্ষক সংখ্যা :৪১ জন ।

কর্মচারীর সংখ্যা :১৩ জন ।

 

  

তথ্য সঙগ্রহ : অধ্যক্ষ ও স্মরণিকা-২০০৯ আল-হিদায়াহ তারিখ: ২৫ ফেরুয়ারী ২০১০

 

 

ঐতিহ্যবাহী জামিয়ার বিভাগসমূহ:

 

 

১। মক্তব বিভাগ :এ বিভাগে শিশু কিশোরদের বিশেষ ট্রেনিং প্রাপ্ত সুদক্ষকারি সাহেবদের মাধ্যমে নূরানী পদ্ধতিতে দোয়া মাসায়িল এবং কুরআন শরীফ সহজ ও সহীহ শুদ্ধ রূপে শিক্ষাদানের সুব্যবস্থা রয়েছে । মাত্র ৩ বছরে আবশ্যকীয় ধর্মীয় বিষয়গুলোর শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা , অংক ,ইংরেজী ,ভূগোল ও ইতিহাস প্রভৃতির শিক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা আছে ।

২। হিফজ বিভাগ:এ বিভাগে হিফজ পড়তে আগ্রহী শিশু-কিশারদেরকে অনূর্ধ্ব ৩/৪ বছরে পূর্ণ কুরআন শরীফ উত্তম রউপে মুখস্ত করানো হয় এবং তাদেরকে তারতীলের সাথে তিলোওয়াত করার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় তালীম তরবিয়াত দেয়া হয় ।

৩। কিতাব বিভাগ :সুবিন্যস্ত শ্রেণী পদ্দতিতে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষা প্রদান করত: সুযোগ্য ওলামা তৈরী করার বারো বছরের বৃহত্তর প্রকল্প ।এ বিভাগে দাওরায়ে হাদিস পযন্ত কুরআন শরীফ ,হাদিস শরীফ ,ফিক্হ ও আরবি সাহিত্যে বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ শিক্ষক মন্ডলী দ্বারা শিক্ষা দান করা হয় এবং এর সঙ্গ প্রয়োজনীয় বিষয়ক জ্ঞানাজর্নের জন্য বাংলা ,অংক ও ইংরেজি প্রভৃতির শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে ।

৪। ক্বিরাত বিভাগ :এ বিভাগে দাওরায়ে হাদীসের চুড়ান্ত পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ ছাত্রদের জন্য পবিত্র কুরআনের তাজবীদ বিষয়ে বিস্তারিত গভীর জ্ঞানের গবেষণামূলক  এক বছরের বিশেষ কোর্সের সুব্যবস্থা।

৫। ফাতওয়া বিভাগ :এ বিভাগে দাওরায়ে হাদিসের চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ ছাত্রদের জন্য দুই বছরের ফাতওয়া বিভাগে বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রদান এবং ইসলামের বিধান মোতাবেক যাবতীয় সমস্যা ও জটিল প্রশ্নাবলীর সমাধান কি ভাবে প্রদান করতে হবে তা শিক্ষা দেয়া হয় এবং পাশাপাশি এ বিভাগ থেকে সকল সাধারণকে দৈনন্দিন জীবনের ধর্মীয় সমস্যার সমাধান দাওয়া হয় ।

৬। প্রকাশনা ও প্রচার বিভাগ:

এ বিভাগ থেকে ইসলামী বই পুস্তক রচনা ও পত্রিকা  প্রকাশ করার মাধ্যমে জনসাধারণকে ইসলামের আদর্শ ও বিধিবিধান বিষয়ে ধারণা প্রদান করা হয় । এ বিভাগ থেকে ক্যালেন্ডার ,রিপোর্ট ,পোস্টার প্রভৃতি ছাপানো হয় ।

৭। দাওয়াত ও তাবলীগ বিভাগ :দেশের সকলস্তরের নাগরিকদের মধ্যে কুরআনী ইনসাফ ,কুরআনী আখলাক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি দ্বীনি ঐতিহ্যের সংরক্ষণ এবং ইসলামী সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য প্রতি সপ্তাহে দু'তিন জামাত বিভিন্ন এলাকায় বের হয় এবং প্রতি বছর ওয়াজ মাহফিল ও ইসলামী জোড়ের ব্যবস্থা করা হয় ।

৮। অর্থ বিভাগ :জামিয়ার তহবিল সংগ্রহ ,সংরক্ষণ ও জমি জমার আয় ব্যায় সঠিক কাযক্রম পরিচালনা করা হয় । জামিয়ার দুটি ফান্ড রয়েছে চাদা ও সাদকা ফান্ড উভয় ফান্ডের পৃথক পৃথক হিসাব সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে ।

চিকিতসা বিভাগ: এ বিভাগ থেকে দৈনন্দিন অসুস্থ ছাত্র ও  শিক্ষকদের ফ্রি হোমিও ঔষধ প্রদান করা হয়, অভাবগ্রস্ত জটিল রোগী ছাত্রকে দ্রুত হাসপাতালে বা ডাক্তারখানায় পৌছনোর ব্যবস্থা করত ,চিকিতসক দ্বারা ব্যবস্তাপত্র ও ঔষধ ফ্রি প্রদান করা হয় ।

৯। পাঠাগার :এ বিভাগ হতে প্রতি সপ্তাহে পাঠ্য বই ছ্ড়া ধর্ম ,সমাজ ,সাহিত্য ও জ্ঞান বিজ্ঞান  বিষয়ক বই পুস্তক বিতরণ করা হয় ।

গ্রন্থাগার :এ কুতুবখানা থেকে প্রাইমারী বিভাগ হতে দাওরায়ে হাদীস ,ক্বীরাত বিভাগ ফাত্‌োয়া বিভাগ পর্যন্ত অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে পাঠ্য বইপত্র বিতরণ করা হয় এবং বছর শেষে তা অাবার গ্রন্থাগারে জমা রাখা হয় ।

১০। যোগাযোগ:মুহতামিম /অধ্যক্ষ:  মাওলানা শাহ শরীফুদ্দিন চৌধুরী

মোবাইল:০১৭১২-৪০১৫৪৭/০১৯১১-১৬০১৭০/০১৭১০-০০০৮২৪/০১৯১৪-০১৭৫৫১

অবস্থান:থানা পোরসা, নওগা।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

নওগাঁ জেলা পরিষদ পার্ক

 

পটভূমিঃ

সহানীয় ভাষ্যমতে বৃটিশ আমলে ১৯২০ সালে নওগাঁ শহরের প্রাণকেন্দ্র নওগাঁ জেলা পরিষদ পার্কটি প্রতিষ্ঠিত হয় । পার্কটি নওগাঁ মৌজার আর এস ৯ নং খতিয়ানে ৮৮১, ৮৮২, ৮৮৩, ৮৮৪, ৮৮৫, ৮৮৬ ও ৮৭ নং দাগে মোট ২.৪৬ একর এরিয়া নিয়ে গঠিত । জেলা পরিষদ, নওগাঁ পার্কের দায়িত্বে রয়েছেন । গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একজন উপ সচিব; যিনি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা পরিষদ নওগাঁর পদে অলংকৃত করে আছেন ।

 

দর্শনীয় বিষয়ঃ

পার্কের ভিতরে ১.২০ একর বিশিষ্ট একটি পুকুর রয়েছে। যার চতুর্পার্শ্বে নারিকেল গাছ ও অন্যান্য গাছ রয়েছে। পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রয়েছে। পুকুরটি খুবই গভীর । পার্কের অভ্যন্তরে দুটি রাস্তা পুরুষ ও মহিলাদের হাঁটার জন্য পৃথকভাবে তৈরী করা আছে। পার্কের অভ্যন্তরীণ ২টি রাস্তা আছে। ভিতরের রাস্তা দ্রুত হেটে অতিক্রম করতে ৩ মিনিট এবং বাহিরের রাস্তার অতিক্রম করতে ৪ মিনিট সময় লাগে। বাহিরের রাস্তার দৈর্ঘ্য ৩৪১৫ ফুট।

 

পার্কের ভিতরটি বিভিন্ন ফুলগাছ, পাতাবাহার, হুইপিং দেবদারুসহ অনেক মূল্যবান গাছ সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য সজ্জিত রয়েছে। পার্কে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, অশোক, অর্জূন, মেহগিনি, কাঞ্চন ঝাউ, পান্থপাদপ, হরতকি, বহেরা ও নারিকেলসহ অন্যান্য গাছ রয়েছে। তাছাড়া মৌসূমে রোপিত গোলাপ, গাঁদা, ডালিয়া, সলভিয়া, রংগন, ভারবেনা, পপি, জিনিয়া, কসমস, কালেনডোলা, এন্টিহামসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ চাষ হয়ে থাকে । নওগাঁ শহরের সর্বস্তরের জনগণ মানসিক ও শারিরিক প্রশান্তির জন্য জেলা পরিষদ, নওগাঁর পার্কটি অত্যন্ত যুগোপুযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে ।

 

  

 

চিত্র সংগ্রহ ও সংযোজন: ড. মোজাফফর আহমেদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), নওগাঁ। তারিখ: ১লা জানুয়ারী  ২০১০

 

পার্কের ভিতরে একটি অফিস কক্ষও রয়েছে। পার্কের দক্ষিণ পূর্ব কোনে একটি ব্যয়ামাগার রয়েছে। মানুষের বসার জন্য ৫ টি ছাতা রয়েছে। তাছাড়া ৪৯ টি বসার সিট রয়েছে। ছোট শিশুদের বিনোদনের জন্য ১৩ টি দোলনা, ৩টি ঢেঁকি ও ১ টি ঝুলন্ত মই সহাপন করা (চালু) আছে। জনগণের জন্য ৩টি শৌচাগার রয়েছে।

 

পার্কের দৈনন্দিন সুষ্ঠু ব্যবসহাপনার জন্য পার্ক সুপারভাইজার ১ জন, মালি ৪ জন ও নৈশ প্রহরী ২ জন নিয়োজিত রয়েছেন। পার্কটি ভোর ৬.০০ টা থেকে রাত ৯.০০ টা পর্যন্ত জনসাধারণের বিনোদন ও চলাচলের জন্য খোলা থাকে ।

 

পার্কের ভিতরে পূর্ব - উত্তর কোনে একটি পাঠাগার রয়েছে। পাঠাগারে বিভিন্ন ধরনের বই রয়েছে ও নিয়মিত দৈনিক পত্রিকাও রাখা হয়। পাঠাগার দেখাশুনার জন্য একজন লাইব্রেরীয়ান রয়েছে। গ্রীষ্মকালীন সময়ে বিকাল ৫.০০ টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এবং শীতকালীন সময়ে বিকাল ৪.০০ টা থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত লাইব্রেরী খোলা থাকে।